ডারউইন টেস্টে ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্ন এখন বাস্তবতার খুব কাছাকাছি বাংলাদেশের। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিন, রোববার, নাটকীয় উত্তেজনায় এগিয়ে চলছে ম্যাচ। বাংলাদেশের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে স্বাগতিকরা একসময় বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও ক্যামেরন গ্রিনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে আবারও লড়াইয়ে ফিরিয়েছে।
তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৬৭ রানে পিছিয়ে ছিল। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৪২৬ রান করায় অস্ট্রেলিয়ার ওপর তৈরি হয়েছিল বিশাল চাপ। এর আগে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ২২৮ রানের বড় লিড নিয়েছিল।
চতুর্থ দিনের শুরুতেই বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার বাকি উইকেটগুলো তুলে নেওয়া এবং স্বাগতিকদের বড় কোনো লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ না দেওয়া। সেই পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখেন অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। দিনের প্রথম সেশনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে আবারও ধস নামান।
তবে একপ্রান্ত আগলে রেখে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ক্যামেরন গ্রিন। বাংলাদেশের বোলারদের দীর্ঘ সময় সামলে তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেঞ্চুরি তুলে নেন। তার দৃঢ় ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিড মুছে দিয়ে পাল্টা লিড নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দিনের প্রথম সেশনের শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৪৩ রানে ৭ উইকেট। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া তখন মাত্র ১৫ রানের লিড পেয়েছে। গ্রিন তখনও অপরাজিত ছিলেন, আর বাংলাদেশের সামনে ছিল অস্ট্রেলিয়ার শেষ তিন উইকেট দ্রুত তুলে নিয়ে রান তাড়ার সুযোগ তৈরি করার সুবর্ণ সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের হয়ে মিরাজের স্পিন ছিল দিনের অন্যতম বড় অস্ত্র। তার নিয়ন্ত্রিত বোলিং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ওপর নিয়মিত চাপ তৈরি করে। অন্যদিকে পেসার তাসকিন আহমেদও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারে চাপ বাড়ান।
প্রথম ইনিংসেই বাংলাদেশের বড় বার্তা
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দেয় সফরকারীরা। বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অপ্রত্যাশিতভাবে ভেঙে পড়ে।
এরপর ব্যাট হাতে বাংলাদেশের হয়ে বড় অবদান আসে তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের কাছ থেকে। তিনি সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে শতরান করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান সংগ্রহ করে, যা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংস।
বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিডের পর অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসও শুরু হয় চাপের মধ্যে। একে একে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটাররা সাজঘরে ফিরতে থাকেন। স্টিভ স্মিথ, মার্নাস লাবুশেনসহ অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটাররা বাংলাদেশের বোলারদের সামনে প্রত্যাশিত আধিপত্য দেখাতে পারেননি।
ইতিহাস হাতছানি দিচ্ছে বাংলাদেশকে
ডারউইনের এই টেস্ট বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়—এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ঐতিহাসিক সুযোগ। ম্যাচ শুরুর আগেই বাংলাদেশ জানত, শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পেতে হলে পাঁচ দিনজুড়ে ধারাবাহিক ক্রিকেট খেলতে হবে। চার দিন শেষে সেই পরিকল্পনাই বাস্তব রূপ পাওয়ার পথে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার শেষ উইকেটগুলো দ্রুত তুলে নেওয়া এবং রান তাড়ায় চাপ সামলানোই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গ্রিনের ব্যাটিং যতক্ষণ টিকে থাকবে, ততক্ষণ অস্ট্রেলিয়ার লিড বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। আর লিড যত বাড়বে, বাংলাদেশের রান তাড়ার চাপও তত বেশি হবে।
ম্যাচের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই দুই দলের সামনে দুই ভিন্ন লক্ষ্য—অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য যতটা সম্ভব লিড বাড়িয়ে বাংলাদেশকে কঠিন লক্ষ্য দেওয়া, আর বাংলাদেশের লক্ষ্য দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ করে ইতিহাসের পথে এগিয়ে যাওয়া।
চতুর্থ দিনের শেষ ভাগ এবং পঞ্চম দিন তাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। ডারউইনে এখন শুধু একটি জয় নয়, বাংলাদেশের সামনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ইতিহাস লেখার হাতছানি।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা